প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ , ১০:৫৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই অশুভ শক্তি, নজর বা বিপদ থেকে রক্ষা পেতে নানা কিছু ব্যবহার করে। যেমন— তাবিজ, গলায় ঝুলানো, বা অন্যান্য প্রতীকী বস্তু। কিন্তু ইসলামী শরীয়ত এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এ সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হল—
কুরআনের দৃষ্টিতে তাবিজ ঝোলানো
তাবিজ, মন্ত্র, ঝাড়ফুঁক প্রভৃতি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর নির্ভরতা সৃষ্টি করে, তবে তা শিরক বা শিরকের মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا
‘মানুষের মধ্যে কিছু লোক জিনদের মধ্যে কিছু লোকের আশ্রয় চাইত, ফলে তারা তাদেরকে আরও বিভ্রান্তিতে ফেলত।’ (সূরা আল-জিন: আয়াত ৬)
قُلۡ اَفَرَءَیۡتُمۡ مَّا تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اِنۡ اَرَادَنِیَ اللّٰهُ بِضُرٍّ هَلۡ هُنَّ كٰشِفٰتُ ضُرِّهٖۤ
‘বলুন! তোমরা কি ভেবে দেখেছ- আল্লাহ আমার কোন ক্ষতি চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাক তারা কি সেই ক্ষতি দূর করতে পারবে?’ (সূরা যুমার: আয়াত ৩৮)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, আল্লাহ ছাড়া কেউ ক্ষতি বা উপকার দিতে পারে না। তাবিজ বা অন্য কোনো বস্তু থেকে সুরক্ষা আশা করা মানে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের ওপর ভরসা করা— যা তাওহীদের পরিপন্থি।
হাদিসের দৃষ্টিতে তাবিজ ঝুলানো
‘تميمة’ (তামিমা) অর্থ হলো তাবিজ, যা অকল্যাণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শরীরের সাথে ঝুলানো হয়। তাবিজ পরিধানকারীর জন্য নবী (সা.)–এর সতর্কবাণী–
مَنْ تَعَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ
‘যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলায়, সে শিরক করেছে।’ (সুনান আহমাদ ১৭৪২২, সুনান হাকিম ৪/৪১৭)
‘التمائم’ (তামায়িম) অর্থ তাবিজ যেটিকে মানুষ মনে করে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবে— অথচ তা আল্লাহর নির্দেশ ব্যতীত অন্য কোনো প্রভাবে বিশ্বাস করা হয়। নবী (সা.) এটিকে ‘শিরক’ বলেছেন, কারণ এতে মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কিছুর ওপর ভরসা করে। তবে কিছু আলেম ব্যাখ্যা করেছেন যে, যদি তাবিজে কেবল কুরআনের আয়াত বা দোয়া লেখা থাকে এবং তার দ্বারা বস্তুগত প্রভাবের বিশ্বাস না থাকে, বরং তা বরকতের নিয়তে হয়, তবে সে বিষয়ে প্রাথমিক যুগে কিছুটা ভিন্নমত আছে। তবু অধিকাংশ সাহাবী ও সালাফ বলেছেন— তাবিজ ঝুলানো থেকে বিরত থাকা উত্তম, কারণ এটি শিরকের পথে ধাবিত করে। হাদিসে পাকে এসেছে-
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয়ই (শিরকপূর্ণ) ঝাড়ফুঁক, তাবিজ এবং প্রেম আনয়নের জাদু— এগুলো সবই শিরক।’ — (আবু দাউদ ৩৮৮৩, মুসনাদ আহমাদ ৩৬০৪, ইবন মাজাহ ৩৫৩০)
তাই শরীয়তসম্মত দোয়া ও রুকইয়াহ করা জায়েজ। কিন্তু তাবিজ, তাবিজে কুরআন লেখা হোক বা না হোক, তা ঝোলানো মাকরূহ বা নিষিদ্ধ। কারণ এটি শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সাহাবিদের আমল
عَنْ زَيْنَبَ امْرَأَةِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ، قَالَتْ: دَخَلَ عَلَيَّ عَبْدُ اللَّهِ وَفِي عُنُقِي خَيْطٌ، فَقَالَ: مَا هَذَا؟ قُلْتُ: خَيْطٌ رُقِيَ لِي فِيهِ. فَقَطَعَهُ، ثُمَّ قَالَ: إِنَّ آلَ عَبْدِ اللَّهِ لَأَغْنِيَاءُ عَنِ الشِّرْكِ، سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ: «إِنَّ الرُّقَى وَالتَّمَائِمَ وَالتِّوَلَةَ شِرْكٌ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী হযরত জয়নাব (রা.) বলেন, ‘একদিন আবদুল্লাহ (রা.) আমার কাছে আসলেন, আমার গলায় একটি সূতার ফিতা (তাবিজ) ঝুলানো ছিল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা কী?’ আমি বললাম, ‘এটি এমন এক সূতা, যাতে আমার জন্য ঝাড়ফুঁক করা হয়েছে।’ তখন তিনি সেটি ছিঁড়ে ফেললেন এবং বললেন- ‘ইবনু মাসউদের পরিবার শিরক থেকে মুক্ত! আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)–কে বলতে শুনেছি— ‘নিশ্চয়ই ঝাড়ফুঁক, তাবিজ এবং প্রেম আনয়নের জাদু— সবই শিরক।’ (মুসান্নাফ ইবনু আবি শাইবা ২৪৫৬৩, মুসনাদ আহমাদ ৩৬০৪, আবু দাউদ ৩৮৮৩)
ফিকহি বিশ্লেষণ
১. তাবিজে কুরআনের আয়াত বা দোয়া লেখা হয়, এবং আল্লাহর বরকত প্রত্যাশা করা হয়, কোনো বস্তুগত প্রভাবের বিশ্বাস নয়। এটিকে কিছু সালাফ (যেমন- ইবনু আব্বাস রা.) শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন করেছেন। এটিকে মাকরূহ / নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
২. তাবিজে অজানা চিহ্ন, সংখ্যা, জ্যোতিষ, অদ্ভুত লেখাসহ ঝুলানো হয়। এটি জাদু ও শিরকের একটি রূপ। যা হারাম ও শিরক।
৩. তাবিজে বিশ্বাস করা হয় যে এটি সরাসরি ক্ষতি বা উপকার দেয়। এটি আল্লাহর তাওহীদের বিরোধী। যা স্পষ্ট শিরক
কিছু সাহাবি ও তাবেয়ী বলেছেন— যদি তাবিজে কেবল কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নামসমূহ থাকে এবং পরিধানকারী এটিকে কেবল বরকত বা দোয়ার প্রতীক হিসেবে রাখে, কোনো ক্ষমতা মনে না করে, তবে তা মাকরূহ (অপছন্দনীয়) কিন্তু শিরক নয়।
৪. ইবনু তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন, ‘তাবিজ, যদিও তাতে কুরআনের আয়াত লেখা থাকে, তা ঝুলানো উচিত নয়। কারণ এটি নবী (সা.)-এর আমলে প্রচলিত ছিল না।’ (মু’জামুল ফতোয়া ১৯/৬৪)
৫. শায়খ ইবনু বায (রহ.) বলেন, ‘সব ধরনের তাবিজ, হোক কুরআনের আয়াতসহ বা ব্যতীত- তা ঝুলানো থেকে বিরত থাকা উত্তম, কারণ তা অবশেষে শিরকের দরজা খুলে দেয়।’ (ফতোয়া ইবনে বায ১/২১২)
নবী (সা.) শরীয়তসম্মত দোয়া ও আয়াত পড়ে ফুঁ দেওয়াকে অনুমোদন করেছেন, যেমন—
> সূরা আল-ফাতিহা,
> আয়াতুল কুরসী (২:২৫৫),
> সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস (মুআউইযাতাইন)। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-
‘যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সকল অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন।’ (তিরমিজি ৩৫৭৫)
সুতরাং তাবিজ ঝুলানো, যে কোনো রূপেই হোক না কেন তা ইসলামে নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ। এটি মানুষের তাওহীদ নষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি করে। প্রকৃত মুসলমান কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে এবং কুরআন ও সহীহ দোয়ার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ مَنۡ یَّتَوَكَّلۡ عَلَی اللّٰهِ فَهُوَ حَسۡبُهٗ ؕ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।’ (সূরা আত-তালাক: আয়াত ৩)
সকল অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে আমাদের শিখিয়েছেন জিকির ও দোআ। হাদিসে এসেছে, আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার এই দোয়া পাঠ করবে—
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ، وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআ’সমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়া লা ফিস সামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম।’
অর্থ: ‘আমি সেই আল্লাহর নামে (আশ্রয় নিচ্ছি), যার নামের সঙ্গে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না— না আসমানে, না জমিনে; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। তাহলে তার কোনো ক্ষতি হবে না।’ (আবু দাউদ ৫০৮৮, তিরমিজি ৩৩৮৮)