গণকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৫ , ১২:৩৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

নিবু-নিবু আলো- কাজী আরজিনা

ভোর হতে প্রায় আধা ঘণ্টা বাকি। বাইরে এখনো ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে—কখনো একটানা, আবার কখনো একটু থেমে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। এখন জাফরের কাশির শব্দ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। সমস্ত নীরবতাকে ভেঙে খান খান করে জাফরের ছোট ভাই আসলাম চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল। জামিলা ক্লান্ত শরীরে খাট থেকে উঠে বসল। টেবিলে থাকা নিবু-নিবু করে জ্বলে থাকা হারিকেনটার আলো বাড়িয়ে দিল। তার ক্লান্ত শরীর এখনই যেন ভেঙে পড়ে যাবে। সংসারের সারাদিন খাটাখাটুনির পরে একটু যে জিরোবে, তার কোনো উপায় নেই।


জামিলা আসলামকে বুকে টেনে আদর করতে লাগল। মায়ের আদর পেয়ে সে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। খাটের একপাশে আসলামকে শুইয়ে দিয়ে জামিলা খাট থেকে নামল। চুলে শক্ত খোঁপা করে, জাফরের ঘরে উঁকি দিতে সে চমকে উঠল। জাফর জানালা খুলে বসে আছে, এক স্থির দৃষ্টিতে—এই দৃষ্টি অন্ধকারে।


জামিলা বুঝতে পারছে না জাফরকে ডাকবে কিনা। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সে বলল, "ঘুমাসনি?" জাফর দৃষ্টি না সরিয়েই বলল, "না, রাতে ঘুম হয়নি।" — "সে কী রে? কেন ঘুম হয়নি? রাতে ওষুধ খাসনি? সারারাত তোর কাশির শব্দ শুনলাম।" — "না, ওষুধ খাইনি।"


জামিলার চোখ-মুখ এবার কঠিন হলো। সে কঠোর গলায় বলল, "কেন খাসনি?" — "বাহ রে! ওষুধ কী করে খাবো? ওষুধ শেষ হয়েছে সে এক সপ্তাহ আগে।"


জামিলার মুখ আগের থেকে নরম হয়ে এসেছে। সে কবে থেকে এমন উদাসীন হলো, ছেলের খোঁজ পর্যন্ত নিল না! ছেলের সঙ্গে কবে থেকে তার এমন দূরত্ব তৈরি হলো যে, মুখ ফুটে বলতে পারল না, "মা, ওষুধ শেষ"। চোখের সামনে ছেলেটা বড় হলো অথচ তার চোখেই পড়েনি। কয়েক মাস পর সে কলেজে যাবে, বয়স ষোলো পেরিয়ে সতেরোতে পড়বে। ও কি সত্যিই অনেক বড় হয়ে গেলো?


জাফর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "বাবা ফেরেনি?" ছেলের কথায় জামিলার হুঁশ ফিরল। সে বলল, "উঁহু, না, এখনো ফেরেনি।"


জামিলা আর দাঁড়াল না। নিজের ঘরে গিয়ে জানালা খুলে বাইরে তাকাল। সবে ভোরের আলো ফুটছে। পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে হারিকেনটা নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়তেই জাফরের কথা তার মাথায় এলো। সত্যিই তো রমিজ আজও ফেরেনি। নাকি সে কোনোদিনই ফিরবে না। আপদটা না ফিরুক, তাই ভালো। অন্তত একটা বোঝা কাঁধ থেকে নেমে যাবে।


স্বামীর সম্পর্কে এমন কথা ভাবতে গিয়ে জামিলা নিজেই অবাক হলো। ছি ছি, এসব আমি কী ভাবছি? রমিজ আমার সন্তানদের পিতা। নিজের উপর তার প্রচণ্ড ঘৃণা হলো। কবে থেকে সে এসব ভাবতে শুরু করেছে? স্বামী কখনো স্ত্রীর উপর বোঝা হয়? এসব ভাবতে গিয়ে জামিলা শব্দ করে কেঁদে উঠল।


ঘরে রান্না করার মতো তিন মুঠো চাল অবশিষ্ট আছে। এত অল্প চালে কয়দিন সংসার চালানো যাবে? জামিলা চাল ভাগ করার চেষ্টা করে—আজকে কয় মুঠো চাল রান্না করা যায়। সে খাবে না, অন্তত তার ছেলে দুটো পেট ভরে খাক। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে। আজকের দিনে সূর্য মাথার উপরে, ভ্যাপসা গরম পরছে। জমে থাকা ঘাম জামিলা কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে চুলায় রান্নার হাঁড়ি বসিয়ে দিল। জাফরকে ডেকে বলল, — "চুলায় ভাত বসিয়েছি, ফ্যান ঝরাতে পারবি না?" — "পারব। তুমি কোথায় যাবে?" — "তোর বাপের খোঁজ নিতে। দেখি চাকরি খোঁজার বাহানায় জুয়া খেলে কোথাও পড়ে আছে কিনা।" — "দেখো, বাবা ঠিক একটা ব্যবস্থা করে নেবে।" — "তা ব্যবস্থাটা কবে করবে শুনি? আমাদের মতো গরিব মানুষের জীবনেও ব্যবস্থা হবে না। তোর বাবার এই এক বাহানা, চাকরি খোঁজার নামে দুই তিন দিন গায়েব। হাতে দুটো টাকা এলেই উনার মনে রঙিন ফুল ফোটে।"


জামিলা গজগজ করতে করতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল। কিছু একটা মনে হতেই পিছন ফিরে তাকাল—দেখল জাফর চুলার দিকে তাকিয়ে আছে।


জামিলা এবার ধীর পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামল। আজকাল তার শরীরটা বড্ড দুর্বল। একটুখানি হেঁটেই সে হাঁপিয়ে যাচ্ছে। জিরিয়ে নিয়ে আবার পথ চলতে হচ্ছে। দশ মিনিট হেঁটে গেলেই আবুল চাচার দোকান। অথচ জামিলার মনে হচ্ছে, কত দীর্ঘ পথ তাকে পাড়ি দিতে হচ্ছে। মরণব্যাধি বাসা বাঁধেনি তো? না, তার মরলে চলবে না। সে মরে গেলে জাফর, আসলামের কী হবে? জাফরের যক্ষ্মা—তাকে চিকিৎসা করাতে হবে। সে সুস্থ হবে, আবার স্কুলে যাবে। অভাবী, দুস্থের ঘরে খোদা সোনার টুকরো পাঠিয়েছে, তাকে নিয়ে জামিলার কত স্বপ্ন! সে কত স্বপ্ন নকশিকাঁথায় বোনে।


— "চাচা, জাফরের বাবাকে দেখেছেন?" খদ্দেরকে বিদায় করে আবুল চাচা বলল, "ও তুমি? না বাপু, দেখিনি। তবে একদিন আগে এসেছিল, বলল, 'চাচা, শহরে আপনার কোনো আত্মীয়স্বজন থাকে?' আমি বললাম, 'থাকে। কেন বলো তো?' সে বলল, 'শহরে আমারে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন?'"


জামিলা বলল, "আপনি কী বললেন?"


আবুল চাচা একটু ভাবার ভঙ্গিতে বলল, "কোথা থেকে তোমাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দেবো? চাকরির বাজারে এখন যা দর বাপু! নিজের জীবন আর ছেলেপিলে নিয়ে টানটান। জামিলাকে উদ্দেশ্য করে—তোমার তো শিক্ষাদীক্ষা ভালোই আছে, তুমি কিছু চেষ্টা করো না?" জামিলা ইতস্তত করে বলল, "কী করব চাচা। চেষ্টা কি কখনো কম করেছি? দুটো ছেলেপুলে পড়াই, তা দিয়ে টেনেটুনে চলে যায়।"


"বাকির খাতা বড় হচ্ছে। জানো তো?"


— "জানি চাচা। দিয়ে দেবো, জাফরের বাবা ফিরুক।"


— "তা সে কি টাকা নিয়ে ফিরবে? দুই মাস হয়ে গেল টাকা শোধ করবে বলে বলে শোধ করলে না। বাপু, আমিও তো গরিব মানুষ, সংসার চালাতে হয়।"


ততক্ষণে দোকানের সামনে আলেয়া এসে দাঁড়ালো। সে আবুল চাচার দিকে তাকিয়ে বললো, — "কী চাচা, জামিলা কী চাইছে, দিয়ে দাও না। সে তো হাওয়া হয়ে যাচ্ছে না। টাকা একদিন না একদিন শোধ করে দিবে।"


জামিলা বললো, — "অত ভেবো না, আলেয়া। আমি কিছু নিতে আসিনি।"


আলেয়া অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বললো, — "তাহলে কেন এসেছিস? এমনি চলে এলি? তুই তো বাড়ি থেকে বের হোস না।"


— "জাফরের বাবার খোঁজ নিতে এসেছি।"


— "তাই বল। তোকে কত বার বলেছি, পুরুষ মানুষকে আঁচলে বেঁধে রাখতে হয়। জানিস না, এরা খচ্চর জাত, ছাড়া পেলেই ফুরুৎ।"


জামিলা কিছু বললো না। তার মাথায় দুটো কথা প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো—পুরুষ মানুষ, খচ্চর জাত, ছাড়া পেলেই, ফুরুৎ, ফুরুৎ, ফুরুৎ। ঠোঁট বাঁকা করে সে হাসলো। আঁচলের শেষ ভাগে সুপারি রাখা, সে গিঁট খুলতে খুলতে আলেয়ার দিকে তাকালো। বিধবা মেয়ে। বয়স কম, কুড়ির বেশি হবে, তবে অনুমান করা কঠিন। সমাজের ভরাডুবি মন্তব্য এবং শব্দচয়নের কাছে চকচকে শরীর, নিতম্ব, বুক ছড়িয়ে পেছনে যায়। দেখতে কুৎসিতই বটে। একবার কেউ তার দিকে তাকালে দ্বিতীয়বার তাকায় না।


যখন জামিলার বিয়ে হয়, আলেয়া তখনও পুতুল নিয়ে খেলত। এত বড় মেয়ে পুতুল নিয়ে খেলতে দেখে জামিলা অবাক হতো, পরে বুঝতে পারল তার তো কোনো খেলার সঙ্গী নেই, কথা বলার কেউ নেই, তাই এই বন্দোবস্ত।


সে রোজ জামিলার সঙ্গে ভাব জমাতে আসত, এটা ওটা নিয়ে সারাদিন প্রশ্ন করে জ্বালিয়ে মারত।


তার কালো কুচকুচে, দরদভরা চোখের মণির দিকে তাকিয়ে জামিলা বিরক্ত হতে পারত না। স্রষ্টা তার সমস্ত দয়া ওই চোখ দুটোতে ঢেলে দিয়েছেন। তিনি মানুষ তৈরিতে খুঁত রাখলেও, তাকে এমন বিশেষ গুণ দিয়েছেন, যার তুলনা হয় না, যা অসীম, অন্যের থেকে তাকে আলাদা, বিশেষণে বিশেষায়িত করে।


আলেয়া প্রায় বলত, "তুই আমাকে যেমন বুঝিস, কেউ এভাবে বোঝে না। তুই আমার সখী, আমার বুবু।" সময় পরিবর্তন হয়েছে, এখন সে বড়, বিয়ে হয়েছে, সংসার হয়েছে, বিধবা হয়েছে। কিন্তু জামিলার জন্য তার দরদ কমেনি, এটুকু পরিবর্তন আসেনি।


তার মনখানা বড্ড ভালো। আঁচলের নিচে লুকিয়ে এটা ওটা জামিলাকে দেয়। এর জন্য মায়ের কাছে কটু কথা শুনলেও সে গায়ে মাখে না।


জামিলা আলেয়ার থেকে চোখ সরিয়ে আবুল চাচার দোকানের দিকে তাকালো। একজন খদ্দের ছাড়া অন্য কেউ নেই। রাস্তাতেও তেমন লোকজন নেই। সে রাস্তার দিকে পা বাড়াল। তার সঙ্গে আলেয়াও পা বাড়াল। জামিলা রাস্তা পার হয়ে বাড়িতে এসে রান্নাঘরের দিকে তাকালো। জাফর একপাশে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। তার পাশে ভাতের হাঁড়ি পড়ে আছে, মাটিতে ভাত ছড়িয়ে ছিটিয়ে।


আলেয়া চিৎকার দিয়ে দৌঁড়ে গেল। জামিলা দৌঁড়াতে পারে না, নিশ্বাস আটকে আসে, হাঁপিয়ে যায়, গলা শুকিয়ে যায়, তৃষ্ণা পায়।


আলেয়া হতভম্ব হয়ে বললো, — "কী লা, জামিলা? ছেলেকে দিয়েছিস ভাতের ফ্যান ঝরাতে। পুরুষ মানুষ ভাতের ফ্যান ঝরাতে যাবে কেন? তারা তো পায়ের উপর পা তুলে পরমায়েশ দেবে। দু-চারিখানা সোহাগের কথা কইবে।"


ততক্ষণে জামিলা এসে পৌঁছাল। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, — "শরীর খারাপ লাগছে?" — "মা, সব ভাত তো ফেলে দিলাম। ঘরে কি চাল আছে?" — "ওসব নিয়ে তোকে ভাবতে হবে কেন?"


আলেয়া বললো, — "আমি জাফরকে ঘরে রেখে আসি। তুই এখানে থাক।"


জাফর আলেয়ার কাঁধের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার কঙ্কালসার দেহখানা দেখা যাচ্ছে। জামিলার বড্ড মায়া হলো ছেলের জন্য। সে সঙ্গে তার দুঃখভরা হাসি পেল, এত বড় ছেলে ভাতের ফ্যান ঝরাতে শিখেনি।


সেইদিন রাতের কথা ভাবতে গেলে জামিলার বুক ভারী হয়ে আসে। মানবজীবন বড়ই অদ্ভুত, এখানে সুখ চিরস্থায়ী হয় না, মুঠোবন্দি করে রাখা যায় না।


জাফরের ছেলেবেলায় সে একদিন রাতে মায়ের কোলে শুয়ে থেকে বললো, — "মা, আমি একদিন ডাক্তার হবো।"


ছোট্ট জাফরের কথা শুনে জামিলা অট্টহাসি হেসে বললো, — "ওমা, তুই তো এখনো অনেক ছোট। ডাক্তারের অতসব কী বুঝিস?"


জাফরের গলায় অভিমান। সে বললো, — "কেন আমি ডাক্তার হতে পারব না? ডাক্তাররা মানুষের জীবন বাঁচায়, একদিন আমিও সবার জীবন বাঁচাবো।" — "নিশ্চয়ই বাঁচাবে। কিন্তু তার জন্য তো আগে বড় হতে হবে।" — "হ্যাঁ, একদিন আমি অনেক বড় হবো।"


সে জাফর কি এখন বড় হওয়ার কথা ভাবছে, সে কি এখনো ডাক্তার হতে চায়? নাকি প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে? "আজকের দিনটা বেঁচে থাকি, কালকের দিনটা বেঁচে থাকি, আর একটা দিন বেঁচে থাকি"—এভাবেই কি সে দিন পার করছে? জামিলার বুক ভারী হয়ে আসে, স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে আসে। কথা যেন আটকে আটকে কল্পনায় ভেসে বেড়াচ্ছে। আয়হায়, মায়ের অসহায়ত্বে জড়জড়িত, কী নিদারুণ, নিষ্ঠুর যন্ত্রণা!


আলেয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে বললো, — "কী লা, জামিলা? কী অত চিন্তা করিস বল তো? আমি আজকে বেশি করে ভাত রেঁধেছি। তোদের জন্য নিয়ে আসি।"


জামিলা চমকে উঠে, আলেয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, — "এসব কি বলছো? আমাদের নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি আবার রান্না বসাবো।"


— "তুই কি আমাকে পর ভাবিস? তোর হাঁড়ির খবর আমি জানি না ভাবছিস?" — "তুমি আমার কে, বল তো? কেন এত কষ্ট করো আমাদের জন্য?" — "আমি তোর সখী, সখী লা সখী। তুই আমার জন্য কম করেছিস লা। কথা বাড়াস না, আমি যাই, একসাথে খাবনি।"


জামিলা আলেয়াকে মানা করতে পারল না। মানা করলেও আলেয়া যে শুনবে না, জামিলা তা ভালো করেই জানে। দুনিয়াতে ভালো মেয়েগুলোর কপালেই দুর্ভোগ লেখা থাকে। নাহলে আলেয়ার মতো অমন মেয়ের হৃদয় কেন কেউ ছুঁয়ে দেখলো না?


সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। জামিলা দুটো হারিকেনের কাচ পরিষ্কার করে আগুন জ্বালাল। একটা হারিকেন জাফরের ঘরে টেবিলের উপর রাখল। ঘরটা বেশ ছোট, ছোট একটি চৌকির পাশে বেশ বড় একটি টেবিল। টেবিলে জাফরের বই-খাতা, রং-পেন্সিল, রং-তুলি রাখা। ছেলেটা রং-তুলিতে এই-ওটা আঁকতে বড্ড ভালোবাসে। স্কুলের রংতুলি প্রতিযোগিতায় দুই-তিনবার প্রথমও হয়েছে। সে সমস্ত অর্জন, পুরস্কার টেবিলের একপাশে সাজানো। প্রায় সে এইগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। জামিলা চায় ছেলে আবার টেবিলে বসুক, সে আঁকুক, সে পড়ুক। সবকিছু ছুঁয়ে দেখুক। দরিদ্রের ঘরে এমন মেধাবী ছেলেকে মানায় না, এর জন্য হাঁসফাঁস করে জামিলা। ভাগ্য তার চরম পরীক্ষা নিচ্ছে, ভালোবেসেই বিয়ে করেছে। সমস্ত কিছু ছেড়ে এসে রমিজের সঙ্গে ঘর বেঁধেছে। সুখের ঘর, যেখানে রোজ সুখের পক্ষীরা এসে পায়চারি করে যেত। দিন যেতেই রমিজের ভিন্ন রূপ চোখে পড়ল, জুয়ার নেশা তাকে টেনে নিল। কী দুঃস্বপ্ন, কী দুর্দশা, দুর্দিনের মোকাবেলা করতে হবে, কে জানত!


জাফর শুয়ে আছে, আজকে তার শরীর ভালো নেই। সারাদিনে একটা কথাও সে বলেনি।


জামিলা জাফরের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে এলো। আসলামকে বুকে নিয়ে কিছুক্ষণ আদর করল। মাকে একটুও জ্বালায় না, যেন সেও মায়ের সমস্ত কষ্ট বুঝে গেছে। তাকে বিছানায় বসিয়ে সে হারিকেনের আলো কমিয়ে দিল। তখনই পিছনের দরজা থেকে শব্দ জামিলার কানে এলো। সে বলে উঠল, — "কে ওখানে?" ফিসফিস স্বরে কেউ বলে উঠল, — "আমি জামিলা। দরজা খোলো।" — "আমিটা কে?" — "আমি রহমত, জামিলা। দরজা খোলো।"


পাশের ঘর থেকে জাফর চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, — "কে এসেছে, মা? বাবা নাকি?" — "জানি না। আমি দেখছি।"


জামিলা হারিকেন নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দরজা খুলে দিল। সে বিরক্ত হয়ে বললো, — "কী চাই, রহমত ভাই?" রহমত অবাক হয়ে যাওয়ার মতো ভঙ্গি করে বললো, — "ভাই! (ভেংচির ভঙ্গিতে) তওবা, তওবা। ভাই, কেন বলছো? রহমত বলো।" — "কেন এসেছেন? সোজাসুজি বলুন, রসের আলাপ করার সময় নেই।" — "আহা! রেগে যাচ্ছো কেন? রমিজ ফিরেছে? জাফরের কী খবর? কিছু লাগলে আমাকে বলো, এনে দিই। ডাক্তার দেখানো লাগবে?" — "কিছুই লাগবে না। আপনাকে এত দরদ দেখাতে হবে না।"


— "শোনো, জামিলা, তুমি আমাকে ভুল বুঝলে বুঝো, কিন্তু দোষ দিও না। দোষ আমি বাপু নিতে পারব না, এতে যে সাপ লাগবে, পাপ হবে। রমিজ নিজের ইচ্ছেতে জুয়া খেলতে যায়, আমি তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যাই না। জাফর আমার ছেলে।"


জামিলা চোখ রাঙিয়ে রহমতের দিকে তাকালে, সে বলে, — "বললাম, ছেলেরই মতো। হতে পারে না?" — "না, হতে পারে না। কোন লজ্জায় এখানে আসেন? এই যে তুমি রেগে যাচ্ছো। একদিন তুমি ঠিকই আমাকে বুঝতে পারবা। বাদ দাও।"


দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো, — "আমার হাতে কী, বলতে পারবে?"


"না।"


"কিছু একটা বলো না। কত দূর থেকে তোমার জন্য এসেছি।"


"আপনার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে আমার নেই। জলদি বিদায় হোন।"


— "আহা, জামিলা। তোমার জন্য এত ভাবি, তোমার চোখেই পড়ে না। দেখো, একখানা শাড়ি আর চুড়ি এনেছি।"


— "আমার এসব লাগবে না। আপনি এখন আসুন, ভাই, আমার কাজ আছে।"


— "জামিলা, তুমি এমন করছো কেন? আমি তোমার ভালো চাই।"


— "আপনি আমার কেমন ভালো চান, আমার জানা আছে।"


রহমতের রাগ হলো। সে পানের পিক ফেলে বললো, — "তা জানো, যেহেতু সাড়া দাও না কেন। একটু শব্দ করে হেসে, রমিজ তো অনেক দিন হলো ঘরে আসে না। তোমাকে বলি, পুরুষ মানুষ ছাড়া নারীদের কি চলে? চলে না। আমাকে ঘরে আসতে বলবা না? কতক্ষণ বাইরে দাঁড়ায়, করায়ে রাখবা।"


— পুরুষ মানুষ ছাড়া নারীদের কি চলে? রহমতের এই কথায় জামিলার শরীর ঘৃণায় ভরে উঠল। কী অবলীলায় সে শব্দগুলো উচ্চারণ করল।


জামিলা এবার চোখ-মুখ শক্ত করল, কঠোর গলায় বললো, — "রহমত ভাই, আপনার এমন কুৎসিত স্বভাবের জন্য গ্রামবাসীর কাছে গণধোলাইয়ে আপনার শিক্ষা হয়নি?"


— "জামিলা, তুমি আমাকে অপমান করছো? ভালো কথা, তোমার পেটে হজম হলো না, দাঁড়াও।"


রহমত ঘরে ঢোকার জন্য হস্তদন্ত শুরু করে দিল। জামিলা প্রাণপণে দরজা আটকানোর চেষ্টা করছে। তার চোখ-মুখে ভয়ের ছাপ, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। সে চিৎকার করতে পারছে না। আশেপাশে কোনো ঘর নেই, বাড়ি নেই। কেউ তার চিৎকার শুনবে না। অসুস্থ জাফরকে সে ডাকতে পারছে না। কী অদম্য শক্তিতে সে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে সে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। বাহিরে থেকে হাঁসফাঁস করতে থাকা রহমত বলে উঠল, "তোকে দেখে নিবো, আজ ছেড়ে দিলাম।"


জামিলা দেখল অন্ধকারের মধ্যে রহমত হেঁটে চলে গেলো। শুকনো পাতার উপর তার পা পড়ছে, তার শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে অনুমান করছে রহমত চলে গেছে। দরজার সাথে ঘেঁষে সে বসে পড়ল, চোখ দিয়ে তার পানি ঝরছে, সে কাঁদছে, শব্দ করে। সে শব্দ নীরবতা ভাঙছে, এ ঘর ছাড়িয়ে অন্য ঘর ছাড়িয়ে অন্য ঘরে যাচ্ছে।


জাফর উঠে বসলো। মায়ের অবস্থা সে বুঝতে পারছে, কিন্তু খাট থেকে উঠে বসার শক্তিটুকু তার শরীরে আর অবশিষ্ট নেই। এখন আর তার বাঁচতে ইচ্ছে করে না, মাকে সে রক্ষা করতে পারছে না, বরং দিনকে দিন বোঝা হয়ে উঠছে, আর কতকাল এভাবে চলতে থাকবে।


তার বমি পাচ্ছে। পেটের ভিতর সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কাশির সঙ্গে বমি। কলিজা যেন ফেটে যাচ্ছে। এখনি পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বেরিয়ে আসবে।


এতক্ষণে বোধ হয় আজরাইল এসে তার দ্বারে দাঁড়িয়ে আছে। সে আজরাইলকে ভয় পায় না, বরং তাকে স্বাগত জানায়। সে আসুক, নিঃশব্দে আসুক, মা যেন টের না পায়। মায়ের জন্য আজরাইল আসতে পারছে না, তাকে বাঁচাতে মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা, ডানা ঝাপটাঝাপটিতে আজরাইলেরও মায়া হয়। সে দূর থেকে দেখে, কাছে আসে না।


জাফর তার মায়ের আগের মুখখানি মনে করার চেষ্টা করে। কেমন লাবণ্য ছড়ানো ছিল তার মায়ের মুখখানি। কোমর অবধি চুল, এখন সে চুলে কবে মা তেল দিয়েছে, সে মনে করতে পারছে না। তার বমি পাচ্ছে, পেটের ভিতর দিয়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। হঠাৎ সমস্ত ঢেউ বাহিরে বেরিয়ে আসে। জামিলা চমকে উঠল। দৌঁড়ে ছেলের ঘরে গেলো। মেঝেতে বমি ছড়িয়ে একাকার। সে জাফরকে জড়িয়ে ধরলো, "এই তো সে শান্তি পাচ্ছে।" পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ সে এখন অনুভব করতে পারছে। তার ইচ্ছে করছে এক্ষুনি মায়ের কোলে মরে যেতে। তাহলে কোনো কষ্ট তার কাছে কষ্ট বলে মনে হবে না। আহা, শান্তি! মায়ের কোলে মরেই সুখ। এর চেয়ে বড় সুখ সে কোথায় পাবে। ছেলের অবস্থা দেখে জামিলা অসহায়ের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, সে কোথায় যাবে।


বর্ষা কড়া নাড়ছে, আকাশ মেঘ করে থাকে। সারাদিন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়। ডোবা-নালা পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হচ্ছে, উঠোন কাঁদা মাটিতে ভিজে থাকে।


জামিলার ছোট্ট রান্নাঘরের চালের ফাঁক দিয়ে টুপ-টুপ শব্দে বৃষ্টির পানি পড়ে। খড়কুটো ভিজে থাকে, চুলায় আগুন দিতে ধোঁয়া হয়। সে ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। কোনোমতে সে রান্না শেষ করে, ঘরে যায়। গতকাল রাতেই বৃষ্টিতে ভিজে চুবচুব হয়ে রমিজ ঘরে ফিরেছে। হাত ভর্তি বাজার নিয়ে, জাফরের ঔষধ নিয়ে। শহরে তার ভালো চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে, বেতনও ভালো। দুটো ঘর সে ভাড়া করেছে, গত মাসেই তারা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হবে বলে সমস্ত কিছু গুছিয়ে রেখেছে।


গরম ভাতের ধোঁয়া উড়ছে, সঙ্গে শিং মাছের ঝোল। ধোঁয়ায় জাফরের চশমা ঝাপসা হয়ে আসে। আজ তার শরীর ভালো লাগছে, মেজাজও ফুরফুরে। কতদিন পর সে শিং মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছে। তার আনন্দ হচ্ছে, মুখখানি আনন্দে ঝলমলিয়ে উঠছে। সে তার বাবাকে দেখছে, মানুষটা এই কয়দিনে কেমন যেন বৃদ্ধ হয়ে গেছে। একগাল দাড়ি, খোঁচা খোঁচা সাদা দাড়ি। চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। মায়ের যতই অভিমান বাবার উপরে থাকুক না কেন, জাফরের কোনো অভিযোগ নেই। সে অভিমান করতে পারে না, বরং এই মানুষটাকে দেখলে তার মায়া হয়।


কালকে রাতে মা প্রচণ্ড রেগে ছিলেন বাবার উপরে। তিনি চাপা গলায় বললেন, — "এতদিন পর কোথা থেকে এলে? খোদা, তোমার মতো আমাদের কেন গায়েব করে দেন না।"


রমিজ জামিলার হাত ধরার চেষ্টা করে। সে শব্দ জাফরের কানে যাচ্ছে। সে সপ্তপর্ণে বাবা-মায়ের কথা শুনে রইল।


— "খবরদার, আমাকে ধরবে না। তোমার কোনো কথা শুনতে চাইছি না।"


রমিজ কিছুটা নরম স্বরে বললো, — "জামিলা, তুমি জানো না এতদিন আমি কী ঝড় সহ্য করে গেছি। আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছি। শুধু তোমাদের কথা ভেবে, তোমাদের জন্য।"


"আমরা কী সহ্য করেছি জানো? না খেয়ে কতদিন ছিলাম। তুমি কেন এলে, কেন আসো? আবার কবে চলে যাবে?"


— "যাবো, যাবো, তোমাদের সঙ্গে করেই এবার যাবো।"


জামিলা অবাক হয়, তার চোখ-মুখে বিস্ময় খেলা করে।


রমিজ বলে উঠলো, — "আমার চাকরি হয়েছে। তোমার মনে আছে আজাদের কথা? সেই আজাদ, বিপ্লবী নেতা আজাদ।"


জামিলা মাথা নেড়ে বললো, — "সত্যি, তোমার চাকরি হয়েছে? আজাদ দিয়েছে?"


— "হ্যাঁ, ওর অফিসেই চাকরি দিলো। মাসে পনেরো-আঠারো দিবে বললো। চাকরি খুঁজতে গিয়েই দেখা হয়ে গেলো। এখন ওর বিশাল ব্যবস্থা, নিজের বাড়ি, গাড়ি। তুমি তো জানো, ইউনিভার্সিটিতে সে প্রথম সারির নেতা ছিলো।"


— "আজাদ আমাকে বোন বলে ডেকেছে। সে ছাত্র আন্দোলনে, ওর হাতে গুলি লেগেছিলো, পালিয়ে আমার কাছে এসেছিলো। সেদিন ওকে হাসপাতালে না নিয়ে গেলে কী হতো, ভাবতে পারছি না। আজাদ আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলো?"


রমিজ বললো, — "জিজ্ঞেস করছে মানে—বলেছে, এক সপ্তাহের মধ্যে যেন চাকরিতে জয়েন করি, ও একটা ঘর ঠিক করে রেখেছে, তোমাকে নিয়ে দেখতে যেতে বলেছে।"


জামিলা উদগ্রীব হয়ে বললো, — "তুমি কী বললে?"


— "কী বলবো? বলেছি, জামিলাকে বলে দেখি। ও রাজি হলে জানাবো। এত তাড়াতাড়ি কাউকে হ্যাঁ বলে দেওয়া যায় না।"


জামিলা বললো, — "ঠিক বলেছো। চাকরি পেয়ে আবার জুয়া খেলতে চলে যাবে না তো?"


রমিজ জামিলার হাতে হাত রেখে বললো, — "জীবনকে যা দেখার দেখেছি, আর জুয়া খেলবো না, এই শপথ করে বললাম।"


জামিলা বিশ্বাস করতে পারে না। সে যে মানুষকে ভালোবেসেছে, এই কি সেই মানুষটা? সে নিজেকেও বিশ্বাস করতে পারে না। মনের মধ্যে এক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে সে জড়িয়ে যায়। রমিজ জামিলাকে পরম যত্নে বুকে টেনে নেয়। জামিলার চোখ দিয়ে পানি ঝরে; সে জানে না, এই কান্না কিসের—সুখের নাকি দুঃখের?


বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াকালীন বাবা পার্টির নেতা ছিলেন। শক্তিশালী নেতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক কণ্ঠী নেতা। কিভাবে সে নেতৃত্ব দিত, মিছিল-মিটিংয়ে যেত, সে গল্পই জাফরকে বলত। গল্পগুলো পুরনো, জাফর বহুবার শুনেছে, কিন্তু বিরক্তি বোধ আসে না। প্রতিবার গল্পগুলোতে নতুন নতুন শব্দ, চরিত্র যোগ করে রমিজ তা রহস্যময় করে তোলে। জামিলাও সেই গল্প শুনে জানে এর শেষ কিভাবে হয়েছিলো। তার চোখ-মুখে বিরক্তি থাকে, সে চায় না তার ছেলে রাজনীতির নীতি শিখুক, সে গল্পগুলো ধারণ করুক। তার কোনো প্রশ্ন নেই, বাক্যলাপ নেই, শুধু তাকিয়ে থাকা—রমিজ এবং জাফরের দিকে, বাবা-ছেলের সম্পর্কের দিকে, জাফরের আগ্রহ ভরা মুখের দিকে, চোখের দিকে। কী নিষ্পাপ হয়ে যায় বাবার কাছে এলে।


আলেয়া উঠোনের কাদা মাটি মাড়িয়ে হেঁটে আসছে। কালো পাড়ের মধ্যে সাদা জরি সুতোর কাজ করা, নতুন শাড়ি। মাথায় দুই বেণী করা, লাল ফিতা দিয়ে বাঁধা, তাকে দেখতে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। তার আঁচলের নিচে কিছু একটা লুকানো। সে এসে ঘরের দরজার পাশে বসলো। রমিজকে দেখে অবাক হলো। আঁচলের নিচ থেকে বড় একটা বাটি বের করে বললো, — "খানিকটা দুধ এনেছি।" রমিজের দিকে তাকিয়ে, "রমিজ ভাই, কবে এলেন?"


রমিজ খালি গায়ে বসে ছিল। আলেয়াকে দেখে ইতস্তত বোধ হলো। একটা গামছা গায়ে জড়িয়ে দিতে দিতে বললো, — "এই তো কালকে রাতে।" — "ওহ। আমি ভেবেছি, বাড়ি-ঘর ভুলে গেছেন। শুনলাম, আপনি চাকরি পেয়েছেন, শহরে যাচ্ছেন।"


— "বেশ শুনেছো। তাই যাচ্ছি, সবাইকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। সেখানেই জাফরের চিকিৎসা করাবো।"


— "শুনে কী যে ভালো লাগছে। আমার সখীর সুদিন কি ফিরছে। কী লা, সখী, সুখ তোর হাতের কিনারায়।"


জামিলা হাসলো, হেসে বললো, — "সুখ কি চিরস্থায়ী হয়, আলেয়া? তা বলি, দুধ কেন আনলে, তোমাকে না নিষেধ করেছি।"


— "ওই যা, তুই নিষেধ করেছিস, ওমনিই আমি মানব।"


অনেক জোরাজুরি করে জামিলা আলেয়ার জন্য ভাত বাড়ল। গরম ভাতের ধোঁয়া তখনও উড়ছে, সঙ্গে ঝোল ঝোল শিং মাছ।


মধ্যরাত। ঘড়িতে শব্দ হচ্ছে, টিক-টিক-টিক। পুরো ঘর জুড়ে সেই শব্দ শোনা যাচ্ছে। জাফরের গায়ে হালকা জ্বর আছে। সন্ধ্যার পর থেকে শরীরটা দুর্বল লাগছিলো। এই দুর্বল শরীরে সে রং-তুলি দিয়ে আঁকাআঁকি করলো, দীর্ঘক্ষণ টেবিলে বসে ছিলো, নিজের বই-খাতা গোছালো, তার প্রাপ্ত পুরস্কারগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলো, সাজালো। বিছানায় গিয়ে জানালা খুলে দীর্ঘক্ষণ বাইরে তাকিয়ে ছিলো, যেন কিছু দেখছে, অন্ধকারে দেখার চেষ্টা করছে। রাতের দিকে কাশি বাড়ল, কয়েকবার কাশির সঙ্গে রক্ত গেলো।


রমিজ গিয়ে ডাক্তার নিয়ে আসলো। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মুখ গম্ভীর করে বললেন, — "কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি, ওইগুলো খাওয়ান। যত দ্রুত সম্ভব সদর হাসপাতালে নিয়ে যাবেন, নাহলে শহরে।"


জামিলা রমিজকে বললো, — "এক সপ্তাহ নয়, কালকেই শহরে চলো।"


রমিজ বললো, — "এতগুলো টাকা কোথায় পাবো?"


— "আমি আজাদ ভাইয়ের সাথে কথা বলবো, তুমি চাকরির টাকা অ্যাডভান্স নিয়ে নিবে। আমি বললে আজাদ ভাই ফিরিয়ে দিবেন না। তুমি যাওয়ার ব্যবস্থা করো।"


শহরে যাওয়ার জন্য গাড়ির বন্দোবস্ত প্রয়োজন। তাই রমিজ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ভোরেই ওরা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। তার এক পরিচিতের গাড়ি আছে, রমিজকে দেখলেই সে কম টাকা চাইবে।


জাফর বিছানায় শুয়ে আছে, তার মাথা জামিলার কোলে। সে পরম যত্নে তার ছেলের সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে—বুকে, গালে, চুলে। জাফরের শরীর ঘামাচ্ছে, চোখ হালকা খোলা, সে টেবিলের উপরে নিবু-নিবু করে জ্বলতে থাকা হারিকেনের দিকে তাকিয়ে আছে। হারিকেনের কেরোসিন ফুরিয়ে আসছে, আলো হালকা বাতাসে নড়ছে।


সে চোখ বন্ধ করলো, তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দম আটকে আটকে আসছে। কথা বলতে পারছে না।


এই হাড্ডিসার ছেলেকে দেখে জামিলার বুক কাঁপছে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। সে দরুদ শরীফ পড়ে ছেলের সারা শরীরে ফুঁ দিচ্ছে। হঠাৎই জাফর চোখ খুলে মায়ের দিকে তাকালো, অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো, — "মা, তুমি আর কেঁদো না।"


এরপর বড় করে শব্দ করে একটা নিশ্বাস ফেলল। চোখ দুটো তখনও মায়ের দিকে তাকানো। জামিলা চিৎকার করে উঠলো, ছেলেকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো। সে চিৎকার করে কাঁদছে, তার হাত-পা কাঁপছে। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে, গলা কাঁপছে।


জাফর… — "জা… জ… জাফর!" — "বাবা, কথা বল। বাবা, আমি কী নিয়ে বাঁচবো? কথা বল।"


জামিলা কান্নায় ভেঙে পড়লো, সে চিৎকার করছে।


ততক্ষণে আশপাশের মানুষ এসে হাজির হলো। রমিজ দৌঁড়ে এলো, সঙ্গে গাড়ি নিয়ে এসেছে। সে এক কোণে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, জামিলার কাছে যাওয়ার সাহস তার নেই, সে কাঁদছে, তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। শব্দ হচ্ছে, রাতের সে নিশীথের সমস্ত নীরবতাকে ভেঙে তাদের কান্নার শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে।


লেখকঃ কাজী আরজিনা