প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৫ , ১২:৪১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
অন্তু নতুন চাকরি পেয়েছে। মানুষ চাকুরির সুবাদে ঢাকা যায় কিন্তু ওকে চাকুরির সুবাদে ঢাকা ছাড়তে হলো। ও যাচ্ছে দিনাজপুরের ছোট্ট একটা উপজেলায়। ভাড়া কম বলে পুরনো এক বাড়ির দোতলায় উঠল। বাড়িটা পুরনো রাজা বাদশার আদলে বানানো। বাড়ির পাশে একটা বিশালাকার মঠও আছে। একটা অদ্ভুত সুন্দর বাড়ি, সবসময় ভেজা গন্ধ, ছাদের কোণে ছত্রাক, আর দরজার কপাট যেন মরমর করে কাঁদে। আশেপাশে ঘুরে দেখতেই কেমন যেন বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। বাড়িওয়ালীর আচরণও অনেক অদ্ভুত। মধ্যবয়সী মহিলা অন্তুর সাথে তেমন কথা বলেন নি। ভাড়া ঠিক করেছে কেয়ারটেকার। বাড়িওয়ালী চুপ করেই ছিলেন। তিনি শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, “খবরদার, বারান্দার আয়নাটা যেন নড়াস না। আগের ভাড়াটিয়ার ছিল।” অন্তুও সম্মতিতে মাথা নেড়ে ঘরের দিকে যায়।
ঘরে ঢুকতেই অন্তু দেখল পুরনো কাঠের ফ্রেমে বিশাল আয়না। আয়নাটার পেছনের অংশে হালকা ফাটল, আর নিচে কালচে দাগ। কোনো একদিন ভেঙে চুরমার হয়েছিল বোধহয়। কেউ হয়তো সে ভেঙে যাওয়া আয়নাটা জোড়া লাগিয়েছে। সে ভেঙে যাওয়া আয়নাটা নিয়ে বাড়িওয়ালীর এত আদিখ্যেতা মানা যায় না। বিরক্তি থাকা সত্ত্বেও বাড়িওয়ালীকে সমীহ করে ও আয়নাটা ফেলে দেয় না। আয়নাটা নিয়ে অন্তুর প্রশ্নের শেষ নেই।
প্রথমের দিকে কোনো সমস্যা না হলেও দিন পনেরো পরে অন্তুর ঘুম ভেঙে যায় কাঁচ ভেঙে যাওয়ার শব্দে। ও সারা ঘর খুঁজে কিছু খুঁজে না পেয়ে আয়নার দিকে তাকায়। কয়েকটা রক্তমাখা নখের ছাপ উঠে আছে আয়নায়। কেউ যেন তার কাঁটা হাত আয়নায় ঘষছে। আর রক্তে ছেয়ে যাচ্ছে আয়নাটা। ভয়ে অন্তুর হাত পা কাঁপতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পরেই অন্তু মাথা ঘুরে পড়ে যায়।
পরের দিন সকালে অন্তুর ঘুম ভেঙে গেলে ও নিজেকে উলঙ্গ অবস্থায় আবিস্কার করে। ঘরের দরজা ভেতর থেকে আটকানো। অন্তু মেঝেতে কেন শুয়ে আছে অন্তু জানে না। অনেক চেষ্টা করেও আয়না ছাড়া অন্যকিছু সে মনে করতে পারছে না। কিছুক্ষণ পরে সিলিং ফ্যানের দিকে চোখ পড়তেই নিজের লুঙ্গি চোখে পড়লো। সিলিং ফ্যানে ঝুলছে। অনেক চেষ্টা করেও ফ্যান থেকে লুঙ্গিটা আলাদা করা গেল না। মনে হচ্ছে যেন কেউ আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে। অন্তু ভয়ে ভয়ে আয়নার দিকে তাকায়। কিন্তু কোনো নখের ছাপ নেই। অন্তু নিজের হ্যালুসিনেশন হয়েছে ভেবে নিজেকে শান্ত করে এবং অন্য আরেকটা লুঙ্গি পড়ে। ঠিক তখনই উপর থেকে লুঙ্গিটা আপনাআপনি পড়ে যায় অন্তুর মাথায়। চোখ মুখ ঢেকে যায়। আর মনে হতে থাকে কেউ জাপটে ধরে রেখেছে। অন্তু ব্যাপারটাকে মনের ভুল ভেবে পাত্তা না দিয়ে ফ্রেশ হতে যায়।
ফ্রেশ হবার পরে অন্তু আয়নায় নিজেকে দেখতে চেষ্টা করে। কিন্তু আয়নাতে একজন অপরিচিতার চেহারা ভেসে ওঠে। ও নিজেকে দেখতে পায় না। অন্তু আবারও আয়নাটা মুছে আয়নায় নিজেকে দেখতে থাকে। এবারও সে থমকে যায়। বাস্তবে ওর মুখে হাসি নেই অথচ আয়নার ভেতরের অন্তু দাঁত কেলিয়ে হাসছে। এবার ও বুঝতে পারে কিছু একটা ঠিক নাই। ও ভয় পেয়ে আয়নাটা ঢেকে রাখে। ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করে আয়নার উপরের কাপড়টা পড়ে গেছে। ওর নিজের ছবিটা আয়নায় স্থির হয়ে গেছে ফ্রেমে বন্দি ছবির মত। ও আরও ভয় পেয়ে ছুটে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু মুহুর্তেই মাথা ঘুরে উঠলো। ও পড়ে গেল। তখন চারপাশ থেকে ও শুধু একটা কথাই শুনতে পায়। ওর মাথার ভেতর কেবল একটা কথাই বাজতে থাকে, "ফিরে আয়। আমার কাছে আয়"। এরপরের ঘটনা অন্তুর মনে নেই।
অন্তু আসরের আযানের সময় চেতনা ফিরে পেয়ে বুঝলো ওর মাথা ঝিমঝিম করছে। আয়নাটা আগের চেয়ে বেশি নতুনের মত লাগছে। ও নোংরা জামাকাপড় ছেড়ে টুপি আর পায়জামা পাঞ্জাবি পরে বেড়িয়ে পড়ে। এবার আর ওর ঘর থেকে বের হতে অসুবিধা হয় না। ও বাজারের দিকে যায়। চায়ের দোকানে বসে। সেখানে কথা হচ্ছিল দোতলার পুরনো ঘর নিয়ে। যে ঘরটায় অন্তু থাকে সে ঘর নিয়েই আলাপ চলছিল। তখন এলজন বলে উঠলো, “ও ঘরে আগে অবনী নামের একজন মহিলা থাকতেন। অনেক সুন্দরী ছিলেন। সারাক্ষণ সাজগোজ করতেন। একদিন হঠাৎ আয়নার সামনে ওর গলা কেটে পড়ে থাকা লাশ দেখা যায়। পুলিশ বলেছিল আত্মহত্যা। কিন্তু কেউ এখনো বিশ্বাস করে না। অমন একজন হাস্যজ্বল মানুষ অকারণে আত্মহত্যা করতে যাবে কেন!
অন্তুর শরীর হিম হয়ে আসতে শুরু করলো। শরীর ঘেমে উঠলো। ও আবারও মাথা ঘুরে পড়ে গেল। সবাই ওকে তুললো, সেবাযত্ন করল ঠিকই কিন্তু কেউ ওকে ঘরে পৌঁছে দিল না। পুরনো যে বাড়িতে যেতে সবাই ভয় পায়। অন্তু নিজেও ওর জ্ঞান ফেরার পরে ও ভাবতে শুরু করেছে। কে এই অবনী! অন্তুকে একা একাই বাড়ি ফিরতে হলো।
সেই রাতেই অন্তু স্বপ্নে দেখল, একটা মেয়ের গলা থেকে রক্ত ঝরছে। মেয়েটার মুখে অদ্ভুত হাসি। আয়নার ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে বলছে "এদিকে আয়। তোকে আসতে হবে। ফিরে আয়।"। ভয়ে অন্তুর ঘুম ভেঙে গেল। সে দেখে ঘরের ভেতরেও একই ঘটনা ঘটছে। ফোনে ভিডিও করতে চাইল সত্যটা প্রমাণ করতে। মোমবাতি জ্বেলে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ভিডিওতে প্রথম কয়েক সেকেন্ডে সব ঠিক ছিল, কিন্তু হঠাৎ ক্যামেরা কাঁপতে লাগল। ওর মনে হলো আয়নায় অবনীর ছবি ভেসে উঠেছে। এর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই মনে হলো কেউ ওর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু পেছন ফিরে তাকিয়ে ও কাউকে দেখতে পেল না।
কিছুক্ষণ পরেই ভিডিওটা মুছে গেল নিজে থেকেই। শুধু ফোনের স্ক্রিনে এক লাইন লেখা, "তুই আমার কাছে আয়। ফিরে আয়"। মোমবাতিগুলো নিভে গেল। বিদ্যুৎও নেই। হঠাৎ আয়নার ভিতরের আলো নিজে থেকেই জ্বলে উঠল, যেন আয়মার ভেতরে একটা রাস্তা। যে রাস্তায় অবনী হাঁটছে। হাত বাড়িয়ে বলল, “চলো, আমার সাথে। তোমাকে যেতে হবে”।
অন্তু ভয় আর কৌতূহলের সাথে আয়নার কাছে এগিয়ে গেল। ঠিক যখন ও আয়নার কাচে হাত রাখল কাঁচটা আগুনের বেশি উত্তপ্ত ছিল। অন্তুর মনে হলো ওর হাত পুড়ে গলে যাচ্ছে। এরপরে একটা বিকট শব্দে সবকিছুই নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
পরদিন সকালে প্রতিবেশীরা দরজায় কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। দরজা ভেঙে ঢুকে দেখে ঘর খালি। শুধু মেঝেতে পড়ে আছে অন্তুর ফোন আর ভাঙা আয়না।ফোনের ভিডিও রেকর্ড দেখছে সবাই। অন্তু আয়নার ভেতরের রাস্তা দিয়ে একজনের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে।
তখনই আয়নায় রক্ত দিয়ে অদৃশ্য কেউ লিখে দিল, " ফিরে আয়। এবার তোরা আয় আমার কাছে। আয়নার ভেতরে।" মুহুর্তেই সবাই মাথা ঘুরে পড়ে গেল।
ঘরটা এখন আর ভাড়া দেওয়া হয় না। তবে মাঝে মাঝে পাশের ফ্ল্যাটের লোকেরা বলে রাতে আয়না ভাঙা ঘর থেকে কারও কণ্ঠ শোনা যায়।