রাশিয়ার তিনটি যুদ্ধবিমান ১২ মিনিট ধরে এস্তোনিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে, যা বাড়িয়েছে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে উত্তেজনা
এস্তোনিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন: রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘অভূতপূর্ব দুঃসাহসিক’ পদক্ষেপের অভিযোগ
টালিন, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ - এস্তোনিয়ার কর্মকর্তারা শুক্রবার দেশটির আকাশসীমা লঙ্ঘনের জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে "অভূতপূর্বভাবে দুঃসাহসিক" আচরণের অভিযোগ এনেছেন। তিনটি রাশিয়ান মিগ-৩১ যুদ্ধবিমান কোনো অনুমতি ছাড়াই ফিনল্যান্ড উপসাগরের উপর দিয়ে এস্তোনিয়ার আকাশসীমায় ১২ মিনিট ধরে প্রবেশ করে, যা ন্যাটো জোটের সামরিক সক্ষমতা এবং সংকল্পের একটি নতুন পরীক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে । এই ঘটনাটি ঘটেছে পোল্যান্ডে ২০টিরও বেশি রাশিয়ান ড্রোন আক্রমণের মাত্র এক সপ্তাহ পরে , এবং যৌথ সামরিক মহড়া "Zapad 2025" শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই ।
এই ঘটনার পরপরই ন্যাটো দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। বাল্টিক এয়ার পুলিশিং মিশনের অংশ হিসাবে এমারি বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত ইতালীয় বিমানবাহিনীর এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলো রুশ জেটগুলোকে বাধা দিতে উড্ডয়ন করে ।এস্তোনিয়ার সরকার তাৎক্ষণিকভাবে রাশিয়ার চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র হস্তান্তর করেছে । এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিমানগুলো কোনো ফ্লাইট পরিকল্পনা ছাড়াই প্রবেশ করেছিল, তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ ছিল এবং এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গেও তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না ।
ক্রম-উত্তেজনা: একটি ধারাবাহিক কৌশল
এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগুস চাখনা এই বছরের মধ্যে এটি চতুর্থ আকাশসীমা লঙ্ঘন হলেও , তিনটি যুদ্ধবিমানের একসঙ্গে প্রবেশকে "অভূতপূর্বভাবে দুঃসাহসিক" বলে নিন্দা জানিয়েছেন । তিনি আরও বলেন, "রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দ্রুত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো উচিত" ।
এই ঘটনাটি একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসাবে বিবেচিত হয়, যেখানে রাশিয়া ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সংহতি পরীক্ষা করছে। নরওয়েজিয়ার আন্তর্জাতিক বিষয়ক ইনস্টিটিউটের রাশিয়ান নিরাপত্তা নীতি বিশেষজ্ঞ যাকুব গোজিমিরস্কি জানিয়েছেন, এটি হয়তো একটি পরীক্ষামূলক অভিযান হতে পারে, তবে পোল্যান্ডে ড্রোনের আগের প্রবেশের পরিপ্রেক্ষিতে এটিকে একটি লক্ষ্যযুক্ত কৌশল হিসেবে দেখা যায় ।
পোল্যান্ডের ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ২০টিরও বেশি রাশিয়ান ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল । এটি ছিল ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রে সবচেয়ে গুরুতর আন্তঃসীমান্ত ঘটনা । ন্যাটো জেটগুলো কিছু ড্রোনকে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়, যা এই যুদ্ধের ইতিহাসে ন্যাটো বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথম সরাসরি পদক্ষেপ ।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও জোটের সংহতি
ন্যাটো জোটের পক্ষ থেকে সামরিক প্রতিক্রিয়া ছিল দ্রুত ও নির্ণায়ক। ন্যাটো মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট এই ঘটনাকে "রাশিয়ার বেপরোয়া আচরণের আরেকটি উদাহরণ" হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং জোটের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা তুলে ধরেছেন । এই প্রতিক্রিয়াটি একটি নতুন প্রতিরক্ষা উদ্যোগ "ইস্টার্ন সেন্ট্রি" এর অধীনে পরিচালিত হয়েছে, যা পোল্যান্ডের ড্রোন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় চালু করা হয়েছিল ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈদেশিক নীতি প্রধান কাজা কালাস এই ঘটনাকে "একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক উস্কানি" বলে অভিহিত করেছেন । তিনি আরও বলেন, "দুর্বলতা দেখালে তা রাশিয়াকে আরও আক্রমণাত্মক হতে উৎসাহিত করবে" । ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি এই ঘটনাকে "অত্যন্ত আপত্তিকর" বলে নিন্দা করেছেন এবং এটিকে "দুর্ঘটনা নয়" বলে সতর্ক করেছেন ।
কিছু ইউরোপীয় সূত্র জানিয়েছে, এস্তোনিয়া ন্যাটোর আর্টিকেল ৪ অনুযায়ী জরুরি পরামর্শের অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে । এই ধারাটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে যেকোনো নিরাপত্তা হুমকির বিষয়ে আলোচনার সুযোগ দেয় । এই ধরনের আলোচনা সামরিক পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যায় না, তবে এটি জোটের রাজনৈতিক সংহতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ।
কৌশলগত দুর্বলতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার এই কার্যকলাপের মাধ্যমে ন্যাটোর "দ্রুত প্রতিক্রিয়া সতর্কতা" (Quick Reaction Alert - QRA) ক্ষমতা, সাড়া দেওয়ার সময়সীমা এবং বিভিন্ন সামরিক ব্যবস্থার আন্তঃসক্রিয়তা পরীক্ষা করা হচ্ছে । পোল্যান্ডে তুলনামূলকভাবে কম মূল্যের ড্রোন ব্যবহার করে ন্যাটোকে তাদের ব্যয়বহুল জেট বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়, যা ন্যাটোর জন্য একটি অর্থনৈতিক দুর্বলতা তৈরি করে ।
ইউরোপীয় কমিশন সভাপতি উরসুলা ভন ডার লেয়েন রাশিয়ার ওপর ১৯তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ ঘোষণার কথা বলেছেন, যার উদ্দেশ্য হলো মস্কোর ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো ।
এই ধরনের উস্কানিমূলক কার্যকলাপ, যেমন কোনো ফ্লাইট পরিকল্পনা ছাড়া 'ডার্ক ফ্লাইট', ন্যাটোর কমান্ড চেইন কতটা কার্যকর তা বোঝার জন্য করা হয় । বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার উদ্দেশ্য হলো ন্যাটোর প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সংকল্প পরীক্ষা করা এবং যেকোনো দুর্বলতা সনাক্ত করা ।