পর্তুগালসহ কয়েকটি দেশ প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দিল
পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য প্যালেস্টাইনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুক্রবার পর্তুগালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, আগামী ২১ সেপ্টেম্বর (রবিবার) আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্বীকৃতি দেওয়া হবে। আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রত্ব নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই পর্তুগালের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম কোরেইও দা মানহা জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেগ্রো এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি ও সংসদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বিষয়টি দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। ২০১১ সালে বামপন্থী রাজনৈতিক দল লেফট ব্লক প্রথম এ প্রস্তাব উত্থাপন করার পর থেকে প্রায় ১৫ বছর ধরে এ নিয়ে বিতর্ক চলছিল।
আন্তর্জাতিক চাপ ও পরিস্থিতি
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক তদন্তে বলা হয়েছে—গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ গণহত্যার শামিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং দেড় লাখেরও বেশি আহত হয়েছেন। আরও বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পর্তুগাল এর আগে জুলাই মাসে জানায়, তারা প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত। সেসময় তারা ‘সংঘাতের ভয়াবহ অগ্রগতি’, মানবিক সংকট এবং ইসরায়েলের দখলদারিত্বের পুনরাবৃত্ত হুমকির বিষয়গুলোকে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।
অন্যান্য দেশের পদক্ষেপ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এক উপদেষ্টা শুক্রবার জানান, সোমবার নিউইয়র্কে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত বৈঠকে অ্যান্ডোরা, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা এবং সান মারিনোও প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কানাডা ও যুক্তরাজ্যও একই পথে হাঁটতে যাচ্ছে।জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৪৭টি দেশ—যা সদস্য রাষ্ট্রের প্রায় ৭৫ শতাংশ—প্যালেস্টাইনকে ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি দিয়েছে। শুক্রবার ১৪৫টি দেশ প্যালেস্টাইনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
বিরোধিতা ও সমালোচনা
ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফ্রান্সের সিদ্ধান্তকে ‘বেপরোয়া’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি কেবল ‘হামাসের প্রচারণাকে শক্তিশালী করবে’। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রতিটি দেশের জন্য পশ্চিম তীরে নতুন অবৈধ বসতি স্থাপন করা হবে।
লুক্সেমবার্গের অবস্থান
সপ্তাহের শুরুতে লুক্সেমবার্গের প্রধানমন্ত্রী লুক ফ্রিডেন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেভিয়ার বেটেল জানান, তারাও প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। বেটেল আরও বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য সংসদে একটি বিল আনা হবে।
জাতিসংঘ ও ইতিহাস
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানিজ দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন, গাজার যুদ্ধ বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের বিভাজন পরিকল্পনায় প্যালেস্টাইনকে মোট ভূমির ৪৫ শতাংশে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। সে সময় জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৭টি, আর অনেক দেশ তখনো ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকায় ভোট দিতে পারেনি।