গণকন্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০২৫ , ০৯:৩৫ এএম

অনলাইন সংস্করণ

#

মফস্বল সাংবাদিকতা: বিভক্তি ও তথ্যের বিভ্রান্তি কেন?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতা, বিশেষত উপজেলা পর্যায়ের সংবাদ পরিবেশন, এক অদ্ভুত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একই উপজেলাতে একাধিক প্রেস ক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠনের অস্তিত্ব এবং একই ঘটনার সংবাদে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য (বিভ্রান্তিকর তথ্য) পরিবেশিত হওয়া—এই দুটি প্রবণতা স্থানীয় সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। কেন মফস্বলে এই তীব্র বিভেদ, এবং কেন তথ্যের এমন ভিন্নতা? এর কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা জরুরি।


১. একাধিক প্রেস ক্লাব ও বিভক্তির কারণ

একটি ছোট প্রশাসনিক এলাকা, যেমন একটি উপজেলা, পরিচালনার জন্য একটি মাত্র শক্তিশালী সাংবাদিক সংগঠনই যথেষ্ট। অথচ বর্তমানে প্রায় প্রতিটি মফস্বল এলাকায় একাধিক প্রেস ক্লাব, সাংবাদিক ফোরাম, বা এমনকি ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক সাংবাদিক গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এই বিভক্তির মূল কারণগুলো হলো:


ক্ষমতা ও নেতৃত্ব দখলের প্রতিযোগিতা: প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা বা প্রভাব বিস্তার করার আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় বিভেদের জন্ম দেয়।


রাজনৈতিক মেরুকরণ: জাতীয় রাজনীতির প্রভাব সরাসরি স্থানীয় সাংবাদিক সমাজেও পড়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সাংবাদিকেরা আলাদা গ্রুপ তৈরি করে, যা পেশাদারিত্বের চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়।


অর্থনৈতিক সুবিধা ও 'সাংবাদিকতার কার্ড বাণিজ্য': কিছু সংগঠন শুধুমাত্র কার্ড বিক্রি বা স্থানীয় বিজ্ঞাপন/সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়, যেখানে পেশাদার সাংবাদিকতার মান রক্ষা গৌণ।


পেশাগত মান ও যোগ্যতার অভাব: পেশাগত মানদণ্ড শিথিল হওয়ায় যে কেউ সহজে সাংবাদিক পরিচয়ে সংগঠনের সদস্য হতে পারে, যা মানসম্মত নেতৃত্বের সংকট তৈরি করে।


২. তথ্যের ভিন্নতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

যখন একই ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে একেক রকম তথ্য নিয়ে প্রকাশিত হয়, তখন পাঠকের কাছে পুরো সংবাদটিই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। এর প্রধান কারণ:


সংবাদ উৎসের দুর্বল যাচাই: দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় স্থানীয় সাংবাদিকেরা অনেক সময় প্রাথমিক তথ্য যাচাই না করেই শুধুমাত্র শোনা কথা বা একটি পক্ষের বক্তব্য প্রচার করেন।


ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রভাব: কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বা কোনো সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষার্থে সংবাদের তথ্য বিকৃত করা হয় বা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দেওয়া হয়।


পেশাগত দক্ষতার অভাব: অনেক মফস্বল সাংবাদিক এখনও প্রশিক্ষণ বা পর্যাপ্ত পেশাগত দক্ষতা পাননি, ফলে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।


সাংগঠনিক বিভেদ: বিভক্ত সংগঠনগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে বা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদ পরিবেশন করে, যা তথ্যের সামঞ্জস্য নষ্ট করে।


প্রতিকার: পেশাদারিত্ব ও ঐক্যের পথে ফেরা

মফস্বল সাংবাদিকতার এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:


১. সাংবাদিক সংগঠনগুলোর একীভূতকরণ: জাতীয় সাংবাদিক সংগঠন (যেমন বিএফইউজে) এবং স্থানীয় প্রেস ক্লাবগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে উদ্যোগ নিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে একটি বা সর্বোচ্চ দুটি পেশাদার সংগঠনের অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় বিভেদ দূর করতে হবে। ২. পেশাগত মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা: সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার জন্য সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা উচিত। জাতীয় পর্যায়ের সম্পাদক পরিষদ বা প্রেস কাউন্সিল এর একটি মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। ৩. প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা: স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিতভাবে সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই, লেখা এবং নৈতিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা জরুরি। ৪. বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি অঙ্গীকার: প্রত্যেক সাংবাদিককে অবশ্যই দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনের অঙ্গীকার করতে হবে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে কঠোর হতে হবে। ৫. প্রেস কাউন্সিলের সক্রিয়তা: প্রেস কাউন্সিলকে মফস্বল সাংবাদিকতার মান পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যের বিকৃতি ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।


মফস্বল সাংবাদিকতা হলো দেশের তৃণমূলের কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠস্বর যদি বিভ্রান্তিকর ও বিভেদপূর্ণ হয়, তবে সামগ্রিক গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়। সময় এসেছে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজকে আত্মসমীক্ষা করে পেশাদারিত্ব ও ঐক্যের পথে ফিরে আসার।


মোঃ শেখ ফরিদ 

কবি ও গণমাধ্যমকর্মী