কর্মসংস্থানের বাজারে বাংলাদেশ: কেন বন্ধ হচ্ছে বিদেশযাত্রার দরজা?
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জন্য বিদেশের শ্রমবাজার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অভিবাসন প্রেরণকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ওমান ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ বা সীমিত রয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার কর্মীর বিদেশযাত্রার স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
রুদ্ধ দুয়ারে হতাশাগত ১৪ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাজারগুলো পুনরায় খোলার বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের জন্য অভিবাসন প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, অতিরিক্ত কর্মী প্রেরণ, ভিসার অবৈধ বাণিজ্য এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকে দায়ী করছেন। তারা সতর্ক করেছেন, জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ ফিলিপাইন ও নেপালের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর কাছে তার বৈশ্বিক শ্রমবাজারের অবস্থান হারাতে পারে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মালয়েশিয়ার বাস্তবতা
সংযুক্ত আরব আমিরাত, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার, ২০১৩ সাল থেকে বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ রয়েছে। যদিও ২০২১ সালের পর কিছুটা অভিবাসন বেড়েছিল, কিন্তু গত বছর এই সংখ্যা ৪৭ হাজারে নেমে আসে। কারণ, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কিছু বাংলাদেশি কর্মী দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষোভ করার পর আমিরাত সরকার ভিসা প্রদান সীমিত করে দেয়।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার বাজার ২০২১ সালে পুনরায় খুললেও, প্রায় ১৮ হাজার কর্মী সময়মতো যেতে না পারায় আটকা পড়েন। উচ্চপর্যায়ের একাধিক সফর ও বৈঠকের পরও কোনো বাস্তব সমাধান আসেনি। বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা কর্মীরা, যেমন মানিকগঞ্জের আনিসুল ইসলাম, বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
কেন এই পরিস্থিতি?
ব্র্যাকের অভিবাসন ও যুব উদ্যোগ কর্মসূচির পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, আমাদের শ্রমবাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে জালিয়াতি, ভিসার কেনাবেচা এবং অতিরিক্ত কর্মী প্রেরণের মতো সমস্যা। তার মতে, একটি সমন্বিত ও ডিজিটাল রিক্রুটমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, সৌদি আরবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শক্তিশালী কূটনীতি, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং সিন্ডিকেট দমনের মাধ্যমেই এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। বায়রা'র সাবেক যুগ্ম-সচিব ফখরুল ইসলাম মনে করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো বৈশ্বিক ব্যক্তিত্বের মর্যাদা ব্যবহার করে সরাসরি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলে হয়তো কিছু বাজার পুনরায় খোলা সম্ভব হতে পারে।
এই অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের লাখ লাখ কর্মীর স্বপ্নকে আটকে রেখেছে এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ রেমিট্যান্স প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।