গণকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ০৪:৫০ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

কে এই আবু ওবায়দা, ইসরাইল কি তাকে সত্যি হত্যা করছে?

রেডিওতে ভেসে আসে তার কণ্ঠ। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায় তার মুখ। মাথা থেকে মুখ পর্যন্ত ঢাকা লাল ক্যাফিয়াত, গায়ে সামরিক পোশাক। তিনি আবু ওবায়দা— হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জুদ্দিন আল কাসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি সংগঠনের সবচেয়ে পরিচিত কণ্ঠস্বর হলেও, আজও তার প্রকৃত পরিচয় অজানা।


আবু ওবায়দাকে ঘিরে আলোচনার ঝড় নতুন করে ওঠে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক আক্রমণের পর। সেদিন থেকেই ইসরাইলের যুদ্ধ মেশিন গাজার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের খবর পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল এই মুখোশপরা বক্তার। তার ঠান্ডা অথচ আগ্রাসী কণ্ঠে প্রতিবার ঘোষণা করা হয় হামাসের সাফল্য, ইসরাইলি সেনাদের ক্ষতি কিংবা বন্দী হওয়ার খবর।


তবে এবার আলোচনায় এসেছে তার মৃত্যুর খবর। ইসরাইল দাবি করেছে, সেনারা তাকে হত্যা করেছে। যদিও আবু ওবায়দা নামটি আসল নয়— এটি আসলে একটি ‘যুদ্ধ নাম’। ধারণা করা হয়, তিনি ৮০-এর দশকের শুরুতে জন্মেছেন। নিজেই একবার বলেছিলেন, তার পরিবার ১৯৪৮ সালে ইহুদি মিলিশিয়াদের হাতে উৎখাত হয়ে গাজায় আশ্রয় নিয়েছিল। সেই শেকড়ের কষ্টই তাকে প্রতিরোধের পথে ঠেলে দেয়।


২০০৪ সালে প্রথমবার তিনি প্রকাশ্যে আসেন। ইসরাইলের উত্তরে স্থল অভিযানের সময় সংবাদ সম্মেলন করেন। তখন থেকেই তিনি কাসামের একমাত্র সামরিক মুখপাত্র। তার দায়িত্ব শুধু সংবাদ জানানো নয়, বরং মানসিক যুদ্ধও চালানো। এজন্য তিনি সবসময় মুখ ঢেকে থাকেন, যাতে প্রতিপক্ষ কখনো তার আসল চেহারা জানতে না পারে।


২০০৬ সালে তিনি ঘোষণা দেন, ইসরাইলি সেনা গিলাদ শালিতকে বন্দী করেছে হামাস। ২০১৪ সালে আবার জানান, আরেক সেনা শাউল এরনকে আটক করা হয়েছে। প্রতিবারই তার বক্তব্য ইসরাইলি সমাজে আলোড়ন তোলে। অক্টোবর ২০২৩-এর আক্রমণের পর তার ভাষণগুলো হয়ে ওঠে আরো জোরালো। তিনি দাবি করেন, ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং প্রায় ৪ হাজার যোদ্ধা এতে অংশ নেয়। এর লক্ষ্য ছিল ইসরাইল দক্ষিণ কমান্ডের গাদা ডিভিশন ধ্বংস করা।


যুদ্ধের খবরের পাশাপাশি মাঝে মাঝে আরব নেতাদের দিকেও তার সমালোচনার তীর ছুটে যায়। এক ভাষণে তিনি বলেন, “আমরা কখনো আরব শাসকদের সৈন্য পাঠাতে বলিনি। কিন্তু তারা যদি সাহায্যের ট্রাকও ঢুকতে না দেয়, তবে সেটাই অবাক করে।”


ইসরাইল বহুবার চেষ্টা করেছে তাকে হত্যা করতে। বলা হয়, তার বাড়ি তিনবার বোমায় উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম দাবি করে, তার আসল নাম হুদাইফা সামির আব্দুল্লাহ আল কাহলুদ। তবে হামাস তা অস্বীকার করে।


গোপনীয়তা, কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং লাল ক্যাফিয়াত মিলে আবু ওবায়দা আজ প্রতিরোধের প্রতীক। আরব দুনিয়ার গ্রাম-শহরে তার পোস্টার দেখা যায়। লেবাননের শরণার্থী শিবিরে মোটরসাইকেল চালকের পেছনে ঝুলে থাকে তার ছবি। শিশুরা টিভির সামনে বসে থাকে— অপেক্ষা করে আবু ওবায়দা এবার কী বলবেন।


২০২৪ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ওয়াশিংটনের ভাষায় তিনি হামাসের “তথ্যযুদ্ধের প্রধান” এবং ইরানের সহায়তায় অনলাইন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। তবে এসব বিষয়ে হামাস কখনো মন্তব্য করেনি।


আজও কেউ জানে না মুখোশের আড়ালে আসল মানুষটি কে। তিনি কি সত্যিই আবু ওবায়দা নামেই পরিচিত, নাকি অন্য কেউ? নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, তিনি শুধু মুখপাত্র নন— বরং প্রতিরোধের এক জীবন্ত প্রতীক।