গণকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ০২:২৯ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

জেলাপ্রীতি নাকি উন্নয়নবৈষম্য

অন্তর্বর্তী সরকারের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ, নিজেদের জেলা কুমিল্লা ও সাতক্ষীরার জন্য বিশাল অঙ্কের দুটি প্রকল্প নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। এ প্রকল্পগুলো দেশের অন্য অনেক জেলায় এর চেয়ে বেশি খারাপ রাস্তা থাকা সত্ত্বেও, কেন এই দুটি জেলাতেই অগ্রাধিকার পাচ্ছে?

কুমিল্লার উন্নয়ন বরাদ্দ
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নিজ জেলা কুমিল্লার জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার একটি বিশাল প্রকল্প নিচ্ছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ (৪৫৩ কোটি টাকা) দেওয়া হয়েছে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরে। এরপরের সর্বোচ্চ বরাদ্দ (৩৩৮ কোটি টাকা) দেওয়া হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহর উপজেলা দেবীদ্বারে।

তবে অবাক করা বিষয় হলো, এলজিইডির হিসেবে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা খারাপ রাস্তার দিক থেকে ৫ নম্বরে থাকলেও, বরাদ্দের দিক থেকে এটি সবার চেয়ে এগিয়ে। এমনকি যেসব উপজেলায় রাস্তার অবস্থা মুরাদনগরের চেয়েও খারাপ, যেমন ব্রাহ্মণপাড়া, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা, যা মুরাদনগরের তুলনায় অনেক কম।

সাতক্ষীরায় সচিবের বিশেষ নজর
একইভাবে, মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আবদুর রশীদ তাঁর জেলা সাতক্ষীরার জন্য ২ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছেন। তিনি নিজেই এই প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা গেছে। যদিও তাঁর দাবি, বিগত ৫২ বছরে সাতক্ষীরায় বড় কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি এবং এই জেলার মানুষ যাতায়াতে অনেক কষ্ট পায়। তবে এলজিইডির হিসাবে, সাতক্ষীরার চেয়েও খারাপ রাস্তা রয়েছে নোয়াখালী, চুয়াডাঙ্গা ও কুড়িগ্রামের মতো জেলাগুলোতে, কিন্তু তাদের জন্য কোনো বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হয়নি।

বিগত সরকারের ধারাবাহিকতা
এর আগেও কুমিল্লায় বেশি বরাদ্দ পাওয়ার অভিযোগ ছিল। সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বাড়িও কুমিল্লায়। অভিযোগ আছে, তাঁদের প্রভাবে তখনো কুমিল্লায় বেশি বরাদ্দ দেওয়া হতো। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন বলে মনে হচ্ছে।

বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মূলমন্ত্র কোথায়?
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর যে সরকার গঠিত হয়েছে, তার মূল স্লোগান ছিল বৈষম্য দূর করা। সেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা আসিফ মাহমুদের জেলার প্রতি এই পক্ষপাতমূলক আচরণ বৈষম্যের প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার সুষম বণ্টনের কথা বলে। অথচ তাদের প্রধান নেতা নিজেই এমন বৈষম্যপূর্ণ প্রকল্পের অংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিষয়টিকে স্পষ্টতই স্বার্থের সংঘাত এবং ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “কর্তৃত্ববাদী সরকারের সময় আমরা এ ধরনের প্রবণতা দেখেছি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমরা দৃষ্টান্ত আশা করি। এই দুই প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া উচিত হবে না।”

অন্যদিকে, মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন ভূঁইয়া অভিযোগ করেছেন, উপদেষ্টা সরকারি টাকায় উন্নয়নকাজ করে নিজের নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এর জবাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুরাদনগর উপজেলার আহ্বায়ক উবায়দুল সিদ্দিকী বলেন, “আসিফ মাহমুদ কোথাও ব্যক্তিগতভাবে এই উন্নয়ন করে দিয়েছেন, এমনটি বলা হয়নি। আমরা সব জায়গায় বলছি এটি বর্তমান সরকারের উন্নয়ন।”

বর্তমানে দেশে অর্থসংকট চলছে এবং সরকার নতুন প্রকল্প নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করছে। এমন সময়ে এই দুটি বিশাল প্রকল্প অনুমোদন পেলে তা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর আরও চাপ তৈরি করবে। তাহলে কি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই এখন প্রশ্নের মুখে?