গণকণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ০৫:২৩ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

হামাসের প্রাণ ভোমরা শেষ?

গাজার আকাশ আবারো কেঁপে উঠলো ভয়াবহ বিস্ফোরণে। ঘনবসতিপূর্ণ আল রিমাল এলাকার একটি ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় একসঙ্গে আঘাত হানে পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে দেয়াল, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে বহু মানুষ। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় চারপাশ। সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে খবর— হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জুদ্দিন আল কাসাম ব্রিগেডের মুখপাত্র আবু ওবায়দা আর বেঁচে নেই।


ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কার্ডস এক্সে পোস্ট করে সেনা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন, “এটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন একটি অভিযান।” তিনি সতর্ক করে দেন, আবু ওবায়দার মতো আরও অনেকে শিগগির একই পরিণতির মুখে পড়বে। তবে হামাস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেনি। তাদের দাবি— এই বিমান হামলায় বহু সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। ভবনটি ছিল একটি দন্ত চিকিৎসকের চেম্বার। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর বাতাসে ভেসে যায় শত শত ডলারের নোট। অনেকেই কুড়িয়ে নিলেও পরে তা আবার উদ্ধার করে হামাস।


প্রায় চার দশকের জীবনে আবু ওবায়দা কখনো প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি তার আসল পরিচয়। সবসময় মাথায় কালো কাপড়, মুখে ফিলিস্তিনি স্কার্ফ, মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে দিতেন দীর্ঘ বক্তৃতা। সেই রহস্যময় চেহারাই ধীরে ধীরে তাকে হামাস সমর্থকদের কাছে প্রতীকে পরিণত করে।


গত শুক্রবারের বক্তৃতায় হয়তো শেষবার শোনা গেছে তার কণ্ঠ। সেখানে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন— “গাজার পরিকল্পিত অভিযান শুরু হলে অবশিষ্ট ইসরাইলি জিম্মিদের ভাগ্য হবে হামাস যোদ্ধাদের মতোই।” আর তার একদিন পরেই এলো মৃত্যুর খবর।


ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে থাকা স্থানীয় নাপিত মোহাম্মদ ইমাদ বিবিসিকে বলেন:

“বিস্ফোরণ এত ভয়ানক ছিল যে ঘন্টার পর ঘন্টা আমি নড়তেও পারিনি। মনে হচ্ছিল পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে। রক্তাক্ত শিশুদের দেখেছি, মানুষ চারদিকে ছুটছিল— যেন সর্বনাশ নেমে এসেছে।”


সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, অন্তত ৭ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন সেই হামলায়। মৃতদের মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। ইসরাইল দাবি করছে, তারা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সব রকম পদক্ষেপ নিয়েছিল— নির্ভুল অস্ত্র, আকাশ পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহল স্বীকার করছে, ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বেসামরিক প্রাণহানি এড়ানো প্রায় অসম্ভব।


গত আগস্টে ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা শহর দখলের নতুন পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি হামাসকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করবেন, যতই আন্তর্জাতিক সমালোচনা আসুক না কেন। কিন্তু জাতিসংঘ সতর্ক করছে— পুরো শহর দখল মানে হবে “বিপর্যয়কর মানবিক পরিণতি”। যুক্তরাজ্যের ইসরাইল দূতাবাসও একে “বড় ভুল” বলেছে।


ইতিমধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি বাড়িঘর ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত। পানি, স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। গাজা শহর এখন বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের ভিড়ে ঠাসা। ইসরাইল বলছে, তারা বাসিন্দাদের দক্ষিণে সরিয়ে নেবে। কিন্তু সেখানেও আগে থেকেই শরণার্থীদের ভিড়।


এই দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে আবু ওবায়দা ছিলেন হামাসের পুরনো নেতাদের একজন, যিনি ৭ অক্টোবরের আগেও বেঁচে ছিলেন। তার মৃত্যু হয়তো ইসরাইলের কাছে বড় সাফল্য। কিন্তু গাজার মানুষের কাছে তা নিয়ে আসেনি কোনো স্বস্তি। বরং ধ্বংসস্তূপের ভেতর জমা হচ্ছে আরও লাশ, আরও কান্না আর প্রতিদিনের মতোই নতুন প্রশ্ন।