প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর ২০২৫ , ০১:৫৪ এএম
অনলাইন সংস্করণ
রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর জনগণের সমর্থন আছে কি না—তা যাচাই করার জন্য যে ভোটাভুটি পরিচালিত হয়, তাকেই গণভোট বলা হয়। গণভোটে ব্যালটের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে কিছু প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রশ্ন তৈরি করে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ মতামত গ্রহণ করা হয়।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তিনবার গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম দুটি ছিল ক্ষমতাসীনদের প্রতি আস্থা যাচাই সংক্রান্ত এবং তৃতীয়টি রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর নিয়ে। বর্তমানে যে চতুর্থ গণভোটের আলোচনা চলছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তার বিষয়বস্তু হলো ‘জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত বিষয় অনুমোদন’।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ঐকমত্য কমিশন প্রধান উপদেষ্টা বরাবর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতির সুপারিশ সংক্রান্ত দুটি খসড়া জমা দিয়েছে। সেখানে গণভোটের ব্যালটে যে প্রশ্নটি থাকবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। প্রশ্নটি হলো—‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং ইহার তপসিল-১-এ সন্নিবেশিত সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত খসড়া বিলের প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে: তপসিল-১-এ কী কী প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে? অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক কোন ক্ষমতাবলে গণভোট আয়োজনের আদেশ দিতে পারে? একই সঙ্গে, পূর্ববর্তী গণভোটগুলোর বিষয় কী ছিল এবং সেগুলোতে জনমতের প্রতিফলন কতটা হয়েছিল?
বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান
জাতিসংঘের সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত নথি এবং দেশের আগের ভোটের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—সংবিধান তৈরি বা সংশোধন, কোনো আইন প্রণয়ন বা বাতিল, এবং শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের মতামত জানার জন্যই মূলত এই প্রক্রিয়া। গণমানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর উদ্দেশ্যেই এটি গণভোট নামে পরিচিত।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘রেফারেন্ডাম ইন কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস’ নিবন্ধ অনুযায়ী, সংবিধান গ্রহণ বা সংশোধনের জন্য আয়োজিত গণভোট হলো এই প্রক্রিয়ার প্রধানতম ধরনগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে বিশ্বের ৫০ শতাংশেরও বেশি লিখিত সংবিধানে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বাংলাদেশে এর আগে অনুষ্ঠিত গণভোটগুলোতে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’—এই দুটি বিকল্পের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিয়েছিলেন।
জাতিসংঘের মতে, ১৯৮৯ সালের পর থেকে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক রূপান্তর ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের ফলে গণভোটের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। এর ফলস্বরূপ সংবিধান সংশোধন বা গ্রহণের ক্ষেত্রে গণভোটের সংখ্যা বাড়ে এবং বিশ্বের বহু সংবিধানে এই সংক্রান্ত বিধান যুক্ত হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধানটি প্রথম যুক্ত হয় দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীতে তা বাতিল করা হয়। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে হাইকোর্ট এক রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধানটি পুনর্বহাল করেছেন।
দেশে গণভোটের ফলাফল
দেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটের সবকটিতেই ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে।
১. প্রথম গণভোট (১৯৭৭): ৩০ মে অনুষ্ঠিত এই গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ ও তাঁর কর্মসূচির প্রতি আস্থা যাচাই। ২ মে সামরিক আইন আদেশ জারির মাধ্যমে এটি আয়োজিত হয়। এতে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট পড়ে ৯৮.৯৭ শতাংশ এবং ‘না’ এর পক্ষে পড়ে ১.১৩ শতাংশ। ২. দ্বিতীয় গণভোট (১৯৮৫): ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অনুসৃত নীতি এবং তাঁর প্রেসিডেন্ট পদে থাকার বিষয়ে। এই ভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট পড়ে ৯৪.১৪ শতাংশ এবং ‘না’ এর পক্ষে ছিল ৫.৫ শতাংশ। ৩. তৃতীয় গণভোট (১৯৯১): ১৫ সেপ্টেম্বর এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বিষয়ে জনগণের সম্মতি জানতে। এই ভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট পড়ে ৮৪.৩৮ শতাংশ এবং ‘না’ এর পক্ষে ছিল ১৫.৬২ শতাংশ।