প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৫ , ১২:১৫ এএম
অনলাইন সংস্করণ
বাংলাদেশ—একটি ভূখণ্ড যার জন্ম হয়েছিল মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক ভয়ংকর বাস্তবতার মুখোমুখি—নৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দেউলিয়াপনার দ্বারপ্রান্তে। সেই বাংলাদেশে আজ জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে তারা, যারা একসময় ছিল ডাকাত, চাঁদাবাজ, খুনি ও সন্ত্রাসী।
২০২৪ সালের তথাকথিত ‘গণঅভ্যুত্থান’—যা অনেকেই ইতিহাসের মোড় ঘোরানো অধ্যায় মনে করেন—সেটি আসলে কতটা বিশুদ্ধ ছিল, তা আজ প্রশ্নের মুখে। দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের ঘৃণা আর ক্ষোভে সৎ, নিরপরাধ শিক্ষার্থীরা যখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের জন্য রাজপথে নেমেছিল, তখনই সেই আন্দোলনের ছত্রছায়ায় ঢুকে পড়েছিল দেশের সবচেয়ে নিকৃষ্ট চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অর্থপাচারকারী, চাঁদাবাজ, খুনি ও দুর্নীতিবাজরা। তারা নীরবে আন্দোলনের স্রোতে ভেসে নিজের অপরাধ ঢেকে নতুন পরিচয়ে বৈধতা আদায়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মাসুম ছাত্র-জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে অতীতের সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত তারা মিটিয়ে ফেলে।
আজ তারা নির্বিকার ভঙ্গিতে দাবি করছে—
“আমরা স্বৈরাচার পতনের জন্য এসব করেছি। এটাই ছিল সংগ্রাম।”
এই দাবি শুধু ভয়ংকর নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করার নৃশংস কৌশল। অপরাধীরা এখন বিপ্লবীর মুখোশ পরে অতীতের ঘৃণ্য অপরাধকে গৌরব হিসেবে তুলে ধরছে। এটা ইতিহাসের সঙ্গে এক বড় প্রতারণা, এবং জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।
আরও ভয়ংকর হলো, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর যারা দেশের মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, তাদের বিরুদ্ধে আজও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও কিছু অপরাধী দেশ ছেড়ে পালিয়েছে বলে শোরগোল উঠেছে, কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে পুনর্বাসিত সেই সন্ত্রাসী বাহিনীকে নিয়ে আজ নীরবতা বিরাজ করছে।
স্বৈরাচারের পতনের পরেও অপরাধীরা ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় রয়েছে, আর রাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি শেখ হাসিনা সরকারের ব্যর্থতার এক অকাট্য প্রমাণ—যারা অতীতে মানুষ হত্যা ও রাষ্ট্র লুটে জড়িত ছিল, তারা আজ নতুন ক্ষমতার অংশে পরিণত হয়েছে।
গত ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনীতির আকাশে যেন আগুন লেগেছে।
“১৭ বছর খাইনি, এখন খাবো”—এই উক্তি শুধু একটি দলীয় স্লোগান নয়, এটি রাষ্ট্রশাসনের এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে লুটপাটকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং দুর্নীতিকে উন্নয়নের বিকল্প বলা হয়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—
কার সম্পদ খাবো? কতদিন খাবো? সেই খাবার আসবেই বা কোথা থেকে? যখন একটি রাষ্ট্র ‘খাওয়ার রাজনীতি’-তে নিমগ্ন হয়, তখন সেটি আর গণতন্ত্র থাকে না, হয়ে ওঠে শোষকের দাস। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গল্প শুনিয়ে মানুষকে ঘুম পাড়ানো হয়, অথচ কেউ জিজ্ঞেস করে না—এই প্রবৃদ্ধির প্রকৃত উপকারভোগীরা কারা? রিজার্ভ নেই, খনিজসম্পদ নেই, শিল্পবিপ্লবও নেই—তবু সবাই খাবে?
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই দায়ভার আগের সরকারের উপর চাপিয়ে দীর্ঘদিন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব রাখতে সক্ষম নয়। আবার যারা ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখছেন, তারাও হয়তো বলবেন—এই দায়ভার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেই নিতে হবে।
যারা একদিন দেশের নিরীহ মানুষের ঘর ভাঙত, চাঁদা তুলত, হুমকি দিত, তাদেরই আজ রাজপথে ‘উন্নয়নের রূপকার’ সেজে মিছিল করতে দেখা যায়। তারা ঘোষণা দেয়—“পরিবর্তন আনবো।” কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—পরিবর্তন কার জন্য? কার নেতৃত্বে? যাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ভূমিদখল, নারী নির্যাতনের মামলা ঝুলে আছে, যাদের নাম শুনলেই মানুষ কেঁপে ওঠে—তারা কি কখনও আলোর পথ দেখাতে পারে? ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে? তার উত্তর আমরা সবাই জানি।
আমি নিজে সেই বিপুল সংখ্যক প্রবাসীদের একজন, যারা একসময় দেশকে কিছু দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আমরা কুলুর বলদের মতো সারাজীবন ঘাম ঝরিয়েছি—দেশ ও মানুষের জন্য। কিন্তু আজও দেখি, সেই ঘামের ফল ভোগ করছে চোর, বাটপার, ক্ষমতালোভী রাজনীতিকরা।
দেশের সাধারণ মানুষ আজ বিভ্রান্ত, হতবাক ও নিরুপায়। কে তাদের পক্ষে দাঁড়াবে? কোথায় যাবে তারা? সামনে নেই কোনো আলো, নেই আস্থার জায়গা। জাতি যেন এক গহীন শূন্যতায় বন্দি।
প্রশ্ন থেকে যায়—
আমরা কি ইতিহাসের এই ভয়ংকর বিকৃতি মেনে নেব? নাকি সত্য উদঘাটনের সাহস দেখাব?
এখন আমাদের করণীয় কী?
এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে মুক্তি পেতে হবে। শুধু ক্ষোভ কিংবা হতাশায় ভুগে থাকা নয়, প্রয়োজন—সচেতন, সুসংগঠিত, দায়িত্বশীল নাগরিক পদক্ষেপ। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক—জনগণ—নিজেদের অধিকার ফিরে পায়।
১. অপরাধীদের কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব একটি স্বাধীন, শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠন করা। এই কমিশন অতীত ও বর্তমানের সব দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থপাচার এবং রাষ্ট্রীয় অপব্যবহার নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে। অপরাধীদের ক্ষমতার গৃহ থেকে বের করে আনতে হবে।
২. রাজনীতিতে নৈতিকতার মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে
রাজনীতি যদি অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়, তাহলে গণতন্ত্র থাকে না, কেবল মুখোশ। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে অপরাধের দায়মুক্তি নয়, বরং কঠোর নৈতিক যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে
“সবাই খারাপ” বলে হাল ছেড়ে দিলে অপরাধীরা জয়ী হয়। জনগণকে বুঝতে হবে, সৎ নেতৃত্ব গড়ে ওঠতে সময় লাগে, কিন্তু সেটাই টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ। সচেতন ভোটার হিসেবে আমাদের নিজেদের দায়িত্ব সচেতনভাবে পালন করতে হবে, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।
৪. প্রবাসীদের শক্তিশালী সম্পৃক্ততা প্রয়োজন
প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠায় না, তারা বিশ্বদর্শন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে, যা দেশের উন্নয়নে অনন্য সম্পদ। সরকারকে ‘প্রবাসী সম্পৃক্ততা নীতি’ গ্রহণ করে তাদের বিনিয়োগ, মেধা ও অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি ও সুযোগ দিতে হবে।
৫. গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটির স্বাধীনতা ও শক্তিশালী ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে
সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ ছাড়া কোনো গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। তাদের কণ্ঠরোধ নয়, বরং উৎসাহিত করতে হবে, কারণ তারা জাতির বিবেক।
শেষ কথা: ইতিহাস এখন আমাদের দিকে তাকিয়ে
এই জাতি কি আবার ভুল পথেই হাঁটবে? নাকি অতীতের শিক্ষায় নতুন এক রাজনৈতিক নৈতিকতা ও মানবিক নেতৃত্ব গড়ে তুলবে?
যদি আমরা আজও কিছু না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু এটুকুই জানবে—
“আমাদের পূর্বপুরুষরা কেবল বলদ হয়ে থেকে গিয়েছিল, শ্রম দিয়েছিল, কিন্তু পরিবর্তন আনতে পারেনি।”
আমরা কি সেই ইতিহাস রেখে যেতে চাই? না, আমরা চাই নতুন প্রজন্ম গর্বের সাথে বলবে—
আমরা সেই জাতি, যারা চোরের রাজত্ব ভেঙে নতুন স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে।
রহমান মৃধা
প্রবাসী বাংলাদেশি, গবেষক ও লেখক
সাবেক পরিচালক, ফাইজার (সুইডেন)